মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় প্রণয়ের ঠিকে থাকার গল্প

0
92

নিউজ ডেস্ক:
মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে প্রণয় বর্মণ। মেধা তালিকায় স্থান পাওয়ায় প্রণয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। নারায়ণ বর্মণ ও মনি বর্মণ দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান প্রণয়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ লাগোয়া বৌলাই নদীর পাড়ে একটি ঝুপড়ি ঘরে বাস করেন প্রণয়ের পরিবার। বাবা নারায়ণ নদী ও হাওরে মাছ ধরেন। মা মণি বর্মণ পাথর ভাঙার মেশিনে শ্রমিকের কাজ করেন। এভাবেই দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে চলছে এ পরিবারটি।
এ খবর শুনে এলাকার লোকজন তার বাড়ি গেলে মণি বর্মণ বিলাপ করে কান্না শুরু করেন। তবে এ অশ্রæ ছিল আনন্দাশ্রæ। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান প্রণয়ের এমন কৃতিত্বে এলাকার লোকজন চমকে উঠেছে। তবে এলাকাবাসীর আন্তরিক ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন প্রণয়ের পরিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাজীবন বাড়ির সামনে বৌলাই নদী আর নদী সংলগ্ন মাটিয়ান, শনি আর টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরছেন নারায়ণ বর্মণ। পরিবার স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য রোদ বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যেই প্রতিদিন নদী ও হাওরে জাল ফেলেছেন। আর সেই মাছ বিক্রি থেকে ভাতের যোগান হয় নারায়ণ বর্মণের পরিবারের। দিনরাত পরিশ্রম আর মাছের আকালে নারায়ণ বর্মণও এখন অনেকটাই কর্মহীন হয় পড়েছেন। বাধ্য হয়েই নারায়ণ বর্মণের স্ত্রী মনি বর্মণ গত সাত বছর ধরে বাড়ি হতে ৭ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত উপজেলার আনোয়ারপুর ও লাউড়েরগড় এলাকায় পাথর ভাঙার মেশিনে পাথর আনা নেয়ার কাজ করেন। মনি বর্মণ প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে অন্য মহিলাদের সাথে দলবেঁধে কাজের সন্ধানে ছুটে চলেন।
আর সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেন। বড় মেয়ে বন্যা বর্মণের বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। ছোট ছেলে সূর্য্য বর্মণ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আর মা মণি বর্মণের সাথে মাঝে মধ্যে পাথর টানার কাজে যান প্রণয়।
মণি বর্মণ জানান, ‘পুলাপানরে ঠিকমতো ভাতেই খাওয়াইতে পারি না। পড়াইতাম ক্যামনে। তবুও জীবন দিয়া চেষ্টা করতাছি আমার এই পুলাডা যাতে পড়তে পারে। পাথর টানতে গিয়ে অনেকবার মাথা ফাটছে, নাক ফাটছে। এখন আর মনে কোন দুঃখ নাই। পোলা আমার যদি ডাক্তার অইতে পারে ; তবেই জীবন আমার স্বার্থক। এখন পুলারে পড়ানির কোন ট্যাকা নাই আমার। ভয়ে আছি টাকার লাগি যদি এখন পড়তে না পারে।’
মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রণয় বর্মণ বাড়ির সামনের মধ্য তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।
প্রণয় জানান, মা-বাবার অমানুষিক শ্রমে আমার এই অর্জন। আমার লক্ষ্য ছিল দেশ সেবায় আমি চিকিৎসক হবো। তবে বর্তমানে আমি আগামী দিনের লেখাপড়ার খরচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি।
তাহিরপুর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি অজয় কুমার দে জানান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে তাহিরপুর। শিক্ষায় বিনিয়োগে হাওরাঞ্চলের মানুষের আগ্রহ কম। দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে প্রণয়ের এমন ফলাফল এলাকার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।
তাহিরপুর উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ জানান, চেষ্টা আর আগ্রহ থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা যায় প্রণয় বর্মণ তা দেখিয়েছে। তাছাড়া সরকার এখন শিক্ষায় নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয় বর্মণের যে কোন সহযোগিতায় সর্বাত্মকভাবে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ইউএনও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here