বন্যায় বিপর্যস্ত জনজীবন, মিলছে না সহায়তাও

0
14

উপর্যোপুরি বন্যা মরার উপর খাড়ার ঘা দাঁড়িয়েছে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের মানুষের জন্য। ঢলে ও টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সুনামগঞ্জে বন্যার পানি বাড়িঘরে প্রবেশ করায় দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।

করোনাভাইরাসের কারণে কাজকর্ম একদিকে বন্ধ অন্যদিকে টানা বন্যায় পানিবন্দি হয়ে না খেয়েই দিন পার করছেন হাওরপাড়ের মানুষরা। অভিযোগ আছে বন্যার দুইদিন পার হলেও বন্যার্ত বেশিরভাগ মানুষই কোন সহায়তা পাননি। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন না স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা, নেননি তাদের কোন খোঁজ খবরও। এদিকে ভারতের চেরাপুঞ্জিুতে বৃষ্টিপাত না কমলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি’র উন্নতি হবে না বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সরজমিনে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর, টুকেরগাও মনমতোচর এবং রাধানগর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলে ও টানা বৃষ্টিপাতে এসব এলাকার রাস্তাঘাট পানি নিচের তলিয়ে গিয়েছে। এছাড়া মানুষের ঘরবাড়ি প্রবেশ করায় জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে তাদের। ওই এলাকার একমাত্র কৃষ্ণ মন্দিরটিও রয়েছে পানি নিচে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মানুষদের। এদিকে ঘরে চুলায় পানি ঢুকে যাওয়ায় রান্না করে খেতেও পারছেন না তারা। পেটের তাগিদে নৌকা করে বাজারে গিয়ে শুকনা চিড়া, মুড়ি কিনেই বাড়ি ফিরে পরিবারের সাথে ভাগ করেই চলছে তাদের পানিবন্দি জীবন।

করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়ে যায় এখানকার অনেক মানুষের কাজকর্ম, তার উপর বন্যায় পানি ঘরের খাট পর্যন্ত উঠে যাওয়ায় ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেকে কষ্টে জীবন যাপন করছেন। তাদের অভিযোগ এখন পর্যন্ত এক বাটি মুড়িও নিয়ে আসেন নি কোন প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি।



অন্যদিকে সুনামগঞ্জে পানি সুরমা নদীর পানি রোাবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলা শহরের সাথে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর এবং জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে বিচ্ছিন্ন। তাছাড়া সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া, কাজির পয়েন্ট, ধোপাখালি, উত্তর আরপিন নগর, নতুনপাড়া এবং নবীনগর এলাকাও মানুষের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করেছে বন্যার পানি।

গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর এলাকার বাসিন্দা সজল দাশ বলেন, আমি মিলে কাজ করি। বন্যার পানি আইয়া আমার মিলে হাটু পানি কাজ বন্ধ। আমরার কেউ এখনো খোঁজখবর নিছে না, আমরা ভালা আছি না মন্দ আছি। আমার ঘরের মেজো ভাইয়ের বাসায় ভিতরে হাটু পানি আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।
 
একই গ্রামের বৃদ্ধা রফিকুন নেছা বলেন, দুইদিন ওইগেছে পানি উঠছে, ঘরের চুলাটাই পানির নিচে কিচ্ছু রানতে (রান্না করতে) পারি না। ছেলে বাজারো গেছে চিড়া মুড়ি কিনান। ছেলেটা আইলে পরে নাতিটারে লইয়া খাইমু। আমরারে কেউ এখন একমুট চিড়াও দিসে না না। ঘরের মধ্যে পানি আর আজকে আরও বৃষ্টি দিতে পানিতো খাটো উঠি যাইবো পরে ঘুমাইতেও পারতাম না।

মনমতো চর গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, আমার ভাই ৭০০ হাঁস আছিল, বন্যার পানিতে আমার দুইশত’র মতো হাঁস পানিত ভাসিয়া গেছে গি। এখন যা আছে এইগুলারেও কোন রকমের রাখছি। নিজের ঘরেরই চুলা জ¦লে না দুইদিন ধরি হাঁস গরুরে খাবার দিতাম কই থকি। আমাদের গ্রামে কেউ এখন কোন সহযোগিতা করছে না শুকনা খাবারও দিছে না।

হোসেনপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী দিলার বেগমের সাথে কথা বলতে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি বলেন, আমার ছেলেটা মারা যাওয়ার পর থকি আমি ও আমার ছেলে বউ দিনমজুরের কাজ করি। কিন্তু এখন বন্যায় কমর পানি। চারটা নাতি-নাতনি আমার এরারে আমি ভাত দিতে পাররাম না। যদি পাশে বাড়ি থকি দেয় তাইলে আগে তারারে খাওয়াই। আমরা পানি আইলে আমরারে কেউ চিনে না কিন্তু ভোট আইলে পাও ধরি সালাম করে।



গৌরারং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, আমি আমার ইউনিয়নের মানুষের পানিবন্দি হওয়া মানুষের কথা উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার রয়েছে, এখন তারা আমাকে আমার ইউনিয়নের প্রয়োজন অনুযায়ী যদি বরাদ্দ দিয়ে দেন তাহলে আমরা খাবারগুলো পানিবন্দি মানুষের মধ্যে বিতরণ করবো।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, আজকে (রোববার) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন থেকে ৬০০ পরিবারকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হইছে। আগামীকাল থেকে আমরা চাল বিতরণ করবো এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আমরা প্রতিনিয়ত খাবার পৌছে দিবো।

এছাড়া সুনামগঞ্জের বন্যা মোকাবেলায় দুর্যোগ ত্রাণ মন্ত্রনালয় থেকে ৪০০ মেট্রিক টন জিআর চাল, নগদ ৮ লক্ষ টাকা, ২ লক্ষ টাকার শিশু খাবার এবং ২ লক্ষ গবাদিপশুর খাবার প্রদান করা হয়েছে, এছাড়া সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কন্ট্রোল রুম এবং সকল উপজেলা নিবার্হী কর্মকতাদের বর্ন্যাতদের পাশে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, বন্যা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে তার কাজ করছে। আমরা দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের দেওয়া বরাদ্দগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া বন্যার মধ্যে করোনা মোকাবেলায় আমরা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সাবান ও পানি বিশুদ্ধ ট্যাবলেট রাখার জন্য বলা হয়েছে। আমাদের এখনও তিন লক্ষ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট রয়েছে যার আমরা প্রতি উপজেলায় ২০ হাজার করে পাঠিয়ে দিয়েছি।

সুনামগঞ্জের সর্বশেষ বন্যা পরিস্থিতি’র বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জে কিছুটা পানি কমলেও সন্ধ্যার দিকে আবারও সুরমা পানি বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত যদি কমে যায় তাহলে আমাদের নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here