একটি নক্ষত্রের পতন

0
18

মুহিত চৌধুরী: বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁর ব্যক্তি ইমেজ ছিলো কিংবদন্তিতুল্য। দলমত সকলের কাছে প্রিয় এমন মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে বিরল। সে প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে। লাখো মানুষের বুক ফাটা শব্দসম্ভারে ফেইবুকের পাতা ভারী হয়ে উঠেছে। তাকে হারিয়ে কাঁদছে সিলেটের মানুষ।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন আওয়ামী লীগের একনিষ্ট এক নেতা। তাঁর হৃদয়জুড়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা। তিনি কখনো পদপদবী কিংবা সুযোগ সুবিধার মোহে অন্ধ ছিলেন না। দীর্ঘদিন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকায়- সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ মানে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এধরনের একটা অবস্থান তিনি তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সুখে দু:খে পাশে নগরবাসীর ছিলেন সবসময়। যে কোনো দুর্যোগ কিংবা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি হলে তিনি সবার আগে ঘটনাস্থলে হাজির হতেন।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞায় সমৃদ্ধ এক নেতা। তাঁর যে অবস্থান কিংবা তিনি যে মাপের নেতা তাকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বেশি মানায়। জননেত্রী শেখ হাসিনা হয়তোবা সেই বিবেচনায় তাকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য করেছিলেন।

ষাটের দশকে ছাত্রলীগে যোগ দেওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ ১৯৭৩ সালে যখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র তখন শুরু হয় দেশের প্রথম পৌর নির্বাচন। এ সময় তিনি সিলেট পৌরসভায় ৬৪৪টি ভোট পেয়ে তোপখানা ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন। সে সময় সিলেট শহরে মাত্র ৫টি ওয়ার্ড ছিল। তোপখানা ছিল ৩নং ওয়ার্ডের অধীন। এরপর ১৯৭৭ সালে আবার নির্বাচন হলো। কমিশনার নির্বাচিত হলেন তিনি।

তারপর কিছু দিনের জন্য দেশের বাইরে চলে গেলেন কামরান। দেশে এসে ১৯৮৯ সালে আবারও নির্বাচনে অংশ নিলেন। তখনও তিনি একই ওয়ার্ড থেকে কমিশনার নির্বাচিত হন। তখন তার প্রতীক ছিল আনারস।

সেই সাফল্যের পথ ধরে এভাবে ১৯৯৫ সালে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নিজ দল ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় অনেকটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি দুইবার মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। কিন্তু ২০১৩ সালে নিজ দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিরোধী দলের প্রার্থীর কাছে পরাজয় মেনে নিতে হলো সাবেক জনপ্রিয় এই মেয়রকে।

করোনার ভয়ে যখন নেতা-নেত্রী স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে জনতার কামরান তখন খাদ্য সহায়তা নিয়ে মাঠে ময়দানে জনতার পাশে। আর এরই ধারাবাহিকতায় এক সময় কামরান ঘাতক করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে চলে আসেন।

গত ৫ জুন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের পিসিআর ল্যাবে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। ওইদিন রাত থেকে প্রথমে বাসায় আইসোলেশনে রাখা হলেও ৬ জুন সকালে বমি আর জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে বমি ও জ্বর কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরে অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়াতে রবিবার (০৭ জুন) সন্ধ্যায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। ঢাকায় তাকে প্লাজমা থেরাপি দেয়া হলে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল। ১৪ তারিখ রাত সাড়ে দশটায় তাঁর মস্তিকে রক্তক্ষরণ হয়। এই অবস্থায় রাত আড়াইটার দিকে তিনি এই নশ্বর পুথিবীকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান।

বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের মুত্যু মানে একটি নক্ষত্রের পতন। তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন সিলেটের মানুষের অন্তরে।

মুহিত চৌধুরী: সম্পাদক দৈনিকসিলেটডটকম, সভাপতি সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here