করোনার মহামারীতে আমরা এবং আমাদের প্রতিবেশীরা

4
137
করোনার মহামারীতে আমরা এবং আমাদের প্রতিবেশীরা
ছবি: ইন্টারনেট

তামান্না সুলতানা: করোনার সংক্রমনে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আমরাই না, পুরো বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। আর আমাদের ছোট দেশ বাংলাদেশে আমরা ও আমাদের পরিবার, প্রতিবেশীরা কেমন আছেন এই দুর্যোগকালে, তা সম্পর্কে সকলেই অবগত।
এই দুর্যোগকালীন মুহূর্তে আমাদের নিরাপত্তায় নিজেদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। তবে এ সময়, প্রতিবেশীদের প্রতিও আমাদের খেয়াল রাখা মানবিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। অসহায় প্রতিবেশীদের প্রতি খেয়াল রাখা সবার আগে জরুরী।

আপনার আর্থিক অবস্থা যেমন হোক না কেন প্রতিবেশীকে দানের জন্য মানসিকতা সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে। আপনি অন্তত খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন তারা ঠিক মতো খেতে পারছে কি-না। নিজের সামর্থ্য না থাকুক সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের কাছে না হয় নিজে অসহায় প্রতিবেশীদের জন্য হাত পাতলেন, কিংবা বিভিন্ন সহযোগিতামূলক সংগঠন থেকে আপনার প্রতিবেশীদের জন্য কিছু ত্রাণ সামগ্রী এনে দিলেন।

আমার নিজের কথাই এখন বলছি, আমার আর্থিক সামর্থ্য খুবই কম। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে যারা কারো কাছে হাত পাততে পারে না কিংবা কার কাছে চাইবে তা-ও জানেনা, আমি তাদের হয়ে বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কাছে সাহায্য চেয়েছি। শুধু দুর্যোগকালীন সময়ে না, আমি অন্যান্য সময় ও তাদের পাশে থাকতে চেষ্টা করি। অসহায় বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি, তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, কিংবা অসহায়দের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা… এসকল বিষয়য়ের জন্য আমি বিত্তবানদের কাছে সাহায্য চেয়েছি। তাদের বিশ্বাস অর্জন করে অসহায়দের পাশে দাড়াতে পেরেছি।

অন্যদের কাছ থেকেই শুধু সহযোগীতা করছি তা কিন্তু নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করি প্রতিবেশীদের ভালো রাখার। কয়েকদিন আগে একজন গরীব আত্মীয় আম্মুকে ফোন করে বলে তার টাকার প্রয়োজন তখন আম্মুর কাছে তেমন কোন টাকা নেই, আমার কাছে ও নেই, লকডাউনে আয়ের সকল উৎস বন্ধ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ মনে পরলো, বিকাশে কিছু টাকা জমা আছে।

রাইটার্স ক্যাফে সাহিত্য গ্রুপ থেকে কবিতা প্রতিযোগিতার পুরুষ্কার হিসাবে পেয়েছিলাম গ্রুপটির কর্ণধার ও আমাদের সাহিত্য গুরু এইচ বি রিতার কাছ থেকে। আরও কিছু টাকা বিকাশে ছিলো সব মিলিয়ে যা ছিলো তাই দিয়ে দিলাম। কারণ আমি জানি মানুষ কতটা অসহায় হয়ে আমাদের মতো মানুষের কাছে হাত পাতে।

আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। প্রায় দুই বছর আগে আব্বু মারা গেছেন, মাকে নিয়ে শহরে একটা ভাড়া বাসায় থাকি। তিনবোন মিলে টিউশনি করে টুকটাক আয় করি আর মামা বাড়ি থেকে কিছুটা আর্থিক সাপোর্ট পাচ্ছি। এই অবস্থাতেও আমার মা আশেপাশের মানুষদের অনেক সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমার চার তলায় থাকি উপরে চিলেকোঠার মতো একটা রুমে একজন মহিলা এবং তার ৫ বছর বয়সী একটা বাচ্চা নিয়ে থাকেন, আমাদের সমাজে যাকে বলে সিঙ্গেল মাদার। মহিলা একটা বেসরকারি স্কুলে শিকক্ষতা এবং সেলাই কাজ করে জীবন যাপন করতেন। কিন্তু ইদানিং সব বন্ধে অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। রমজানের দুদিন আগে এক বিকালে আমার আম্মু সেই মহিলাকে দেখতে যান। কুশল বিনিময় করে বললেন কোনো কিছু দরকার হলে যেনো আমাদের বলেন আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করবো। কিন্তু মহিলা মনে মনে হয়তো সংকোচ বোধ করেছিলেন তাই আসতে পারেননি। কিন্তু আম্মু প্রথম রমজান থেকে আজকে পর্যন্ত মহিলার বাসায় ইফতার পাঠাচ্ছেন নিয়মিত, সাহরির জন্য খাবার পাঠাচ্ছেন। আমরা অনেক কিছুই লোকচক্ষুর অন্তরালে করে থাকি কিন্তু উদাহরণ হিসেবে এসব বলতে হয়েছে।

সবশেষে বলব, দানের আগে ত্যাগ স্বীকার করার মতো মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন আমাদের এবং নিজ থেকেই প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় আত্মসংকোচে হয়তো আপনাকে কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু অনাহারে অর্ধাহারে জীবনযাপন করছেন আপনার প্রতিবেশী। অথচ আপনি জানেন না।

আরেকটা আকুল আবেদন সবার কাছে, রমজানে বিত্তশালীদের বাসায়ও ইফতার পাঠানোর একটা প্রচলিত নিয়ম আছে যা নিস্প্রয়োজন। দয়া করে সেই ইফতার আপনার গরীব কোনো প্রতিবেশীকে দিন অন্তত ভালোভাবে ইফতার করতে পারবে। এই দুর্যোগকালীন সময়ে আসুন মানবিক হই। আসুন নিজেকে প্রকাশ করি। আমাদের আশেপাশে কেউ না খেয়ে আছে কিনা আসুন তার খোঁজ নেই। আমাদের প্রতি প্রতিবেশীদের যে একটা অধিকার আছে, আসুন সেটা আদায়ের চেষ্টা করি।। আপনার জন্য যদি আপনার প্রতিবেশী একটু ভালো থাকতে পারে, তাতে ক্ষতি কিসের?

4 COMMENTS

  1. কলামিস্ট এবং তার পরিবারের সদস্যের এমন মানবিক দিকটা বেশ ভালো লেগেছে,স্যালুট এর জন্য। আসলেই আমাদের উচিৎ সামর্থ্যানুযায়ী বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ; বিশেষত প্রতিবেশীর পাশে। কেননা,তাদের হক রয়েছে যা পবিত্র আল-কোরআনেও উল্লেখ্য রয়েছে।

  2. কোরান ও হাদিস মোতাবেক প্রতিবেশীদের হক আদায় করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।

  3. বিপর্যস্ত দিনে যে মানুষের পাশে দাড়ায় তারাই প্রকৃত মানুষ। কলামিস্ট ও তাদের পরিবারের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ এমন উদ্যোগ এর জন্য।

  4. এইরকম উদ্যোগ সবাইকে নেয়া উচিত। ধন্যবাদ আপনাকে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here