লিবিয়ায় যেভাবে বাংলাদেশিদের ‘দাস’ বানাচ্ছে পাচারকারীরা

0
65

নিউজ ডেস্ক:
উন্নত জীবন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টায় মরিয়া বাংলাদেশিরা। ইউরোপের দেশগুলোতে ঢোকায় আশায় কয়েক বছর ধরে পাচারকারীদের সহায়তায় লিবিয়া যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। তাদের একটি অংশের সলিল সমাধি ঘটছে ভূমধ্যসাগরে। কারও ঠাই হচ্ছে লিবিয়ার ক্যাম্পগুলোতে।

আবার মানবপাচারকারীদের চাহিদামত মুক্তিপণ দিতে না পারায় তাদের বিক্রি করা হচ্ছে দাস হিসেবে। লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের করুণ কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।

আফ্রিকার সাংবাদিকদের কাছ থেকে বেশ কিছু চিঠি পাওয়ার পর বিবিসির ইসমাইল এইনাশ নামের এক তরুণের সঙ্গে দেখা করেন। কীভাবে তিনি প্রতারিত হওয়ার পর লিবিয়ায় গিয়ে কাজ করেছেন এবং কীভাবে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন বাংলাদেশি তরুণ তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথাই ইসমাইলকে শোনান।

ভুক্তভোগী ওই বাংলাদেশি অভিবাসী এখন আছেন ইতালির পলিমারোতে। সেখানেই ইসমাইল এইনাশের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। চেয়ারে অস্বস্তিকর অবস্থায় বসে নিজের মুঠোফোন হাতে নাড়াচাড়া করতে করতে লিবিয়ায় তাঁর যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন তিনি।

ঝুঁকিপূর্ণ জীবনকে আরও ঝুঁকিতে না ফেলতে নিজের নাম প্রকাশ করতে আগ্রহী হননি ওই তরুণ। ধরা যাক ওই যুবকের নাম সাইফুল ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ১৯ বছর বয়সে বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আলীর এই ঝুঁকির জীবন শুরু হয়েছিল। ‘দালালরা’ কীভাবে কৌশলে তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রাখে, কীভাবে সেখান থেকে তিনি পালিয়েছেন, সেই কাহিনী তিনি বলেছেন বিবিসির কাছে।

তিনি জানান, বিদেশে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক দালাল। এই মানবপাচারকারীরা সোশাল মিডিয়ায় কৌশলি প্রচারণায় তরুণদের প্রলুব্ধ করে।

‘আমার পরিবার চেয়েছিল আমি বিদেশে যাই, কিন্তু বয়স কম হওয়ায় পারিনি, ভুয়া পাসপোর্ট করার জন্য তাই তারা দালালকে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আমার বয়স দেখানো হয় ২১ বছর।’

যে দালালের পরিচয় হয়েছিল, সে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিয়মিত লিবিয়া যাওয়ার প্ররোচণা দিত। এমনকি তাকে বাড়িতে রাতের বেলা দাওয়াত করেও খাওয়াত।

বাংলাদেশে থাকার সময় ঢাকার কাছে একটি শহতলীতে কয়েক বছর একটি প্রসাধনীর দোকানে কাজ করে পদ্মা পাড়ের একটি গ্রামে নিজ পরিবারকে সহায়তা করার চেষ্টা করতেন এই তরুণ।

তার লিবিয়া সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু দালালরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, লিবিয়ার কারখানায় কাজ করে তাদের ছেলে মাসে ৫০০ ডলার আয় করতে পারবে। পরে অবশ্য তার বাবা-মায়ের সঙ্গে তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

সাইফুলের বাবা-মা দালালদের বলেছিল, লিবিয়া যাওয়ার খরচ তারা যোগাতে পারবেন না। কিন্তু তাদের তিনটি বড় আকারের গরু দেখে দালালরা সেখান থেকে একটি বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থা করার বুদ্ধি দেয়। পরে তাদের প্রলোভনে লিবিয়া যেতে আগ্রহী হন সাইফুল।

মুক্তিপণের জন্য বন্দি

সাইফুল জানায়, দালালদের কথায় বিশ্বাস করে প্রথমে ঢাকা থেকে বাসে যাত্রা শুরু করে ভারতের কলকাতায় নেয়া হয় তাকে। সেখানে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজে কয়েক দফায় মুম্বাই, দুবাই এবং কায়রো হয়ে লিবিয়া পৌঁছাতে আলীর সময় লেগেছিল এক সপ্তাহ।

পরে দালালের লোকেরা তাকে সেখান থেকে দ্রুত একটি বন্দিশালায় নেওয়ার পর তার কাছে থাকা সব টাকা নিয়ে নেয়। এরপর তাকে মুক্তিপণের জন্য সেখানে আটকে রাখে। তাকে মুক্ত করার জন্য তার বাবা-মাকে শেষ গরুটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে।

সাইফুল বলেছেন, বন্দিশালায় ছোট একটি কক্ষে তার সঙ্গে আরও ১৫ জন বাংলাদেশি ছিলেন। যারা মুক্তিপণের টাকা দিতে পারত না তাদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হত না এবং মারধর করা হত।

‘তারা আমার সামনে একজনকে পিটিয়েছিল, এক সময় তার উরুসন্ধি থেকে রক্তপাত শুরু হয়। তারা ওই ব্যক্তিকে কোনো চিকিৎসা দেয়নি, হাসপাতালেও নেয়নি।

কাজ থামালেই লাথি

সাইফুল জানায় এখানেই শেষ নয়, বন্দিশালা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বেনগাজিতে পাচারকারীদের একটি পানি বোতলজাত করার কারখানায় কাজ পান তিনি। পরে ত্রিপোলিতে গিয়ে একটি টালি কারখানায় কাজ করতে হয় তাকে।

সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া দুর্বিষহ এক পরিবেশে ছিলেন তিনি। তার মত এমন ২০ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়ায় রয়েছেন বলে সম্প্রতি এক হিসাব পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

সাইফুল বলেন, কাজ থামালেই আমাদের মারধর করা হতো, লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিত। একবার আমাদের একজন একটা টালি ভেঙে ফেলায় একজন এসে তাকে লাথি মারতে শুরু করে।

টালি কারখানার মালিক কিশোর বয়সীদের বাসায় তালা দিয়ে আটকে রাখতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মালিক আমাদের কাজে নিয়ে যেতেন এবং কাজ শেষ হলে বাসায় ফিরিয়ে নিতেন। আমাদের নজরদারির জন্য দুইজন পাহারাদার ছিলেন।

‘কাজের জন্য আমাদের কোনো মজুরি দেওয়া হত না এবং পর্যাপ্ত খাবারও পেতাম না। যে কারণে আমরা পালিয়ে যেতে চাইতাম, আমাদের একজন পালানোর চেষ্টা করে তিন তলা থেকে পরে পা ভেঙে ফেলে।’

পরে কয়েক দফা পালানোর ব্যর্থ চেষ্টার পর লিবিয়ার এক ব্যক্তি সাইফুলকে মসজিদে আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করেন। তবে তার মনে হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছাতে তাকে আবারও পাচারকারীদের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হবে।

সাগর পাড়ি

পরে কৌশলে পালিয়ে সাগর পাড়ি দেন সাইফুল। সাগর পাড়ি দিতেও আলীর বাবা-মাকে আবারও অর্থ যোগাড় করতে হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে ইতালি পর্যন্ত দুর্ভোগের এই যাত্রায় সব মিলিয়ে তার পরিবারকে প্রায় চার হাজার ডলার যোগাড় করতে হয়েছে। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ নিতে হয়েছে।

পরে গত বছর জুলাই মাসে ডিঙি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পারি দেওয়ার সময় ৭৯ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর সঙ্গে আরও একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয় সাইফুলকে।

সাগর পাড়ি দেয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাইফুল বলেন, দুই দিন আমরা সাগরের পানি ছাড়া কিছু দেখি নাই, কোনো কূল কিনারা নাই। এক পর্যায়ে আমরা দূরে দুটি হাঙর দেখতে পাই। কয়েকজন বলে, তারা আমাদের খেতে আসছে। ভাবলাম, আমরা শেষ। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করে ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পৌঁছান সিসিলি।

এখন সিসিলির প্রধান শহর পালেরমোতে অভিবাসীদের একটি শিবিরে থাকেন। নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া এবং সেনেগাল থেকে আসা তরুণ অভিবাসীরাও রয়েছেন সেখানে।

তিনি জানান, লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের নিজেদের মধ্যে কিংবা অন্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। পাচারকারীদের ওই বন্দিশালায় বিভিন্ন দেশের মানুষকে আলাদা আলাদা রাখা হত।

সাইফুল এখন ইতালিতে কাজের অস্থায়ী অনুমতি পেয়েছেন। কিন্তু আশ্রয় চেয়ে করা তার আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।

বর্তমানে পালেরমোয় বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন সাইফুল। সেখানে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সঙ্গে সুশি রেস্তোরাঁয় কাজ নিয়েছেন।

সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করে তিনি মাসে পান ৮৭০ ডলার, যা সিসিলিয়ানদের আয়ের তুলনায় নিতান্তই সামান্য। ওই আয়ের মধ্যে ৫৭০ ডলার তিনি দেশে বাবা-মাকে পাঠাতে পারেন।

সুশি নামে যে একটা খাবার আছে, সে কথা আগে জানা ছিল না আলীর। ধীরে ধীরে কাঁচা মাছের স্বাদ তার ভালই লাগতে শুরু করেছে, নতুন করে তিনি স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছেন সাইফুল। এখন স্বপ্ন দেখছেন সুশি বানানো শিখতে আর ইতালির ভাষাটা আয়ত্ত করতে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন সুবিধাবঞ্চিত যারা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে চায় দালালরা তাদের সেই স্বপ্নকেই পুঁজি করে আসছে। লিবিয়ার উদ্দেশে যারা পাড়ি জমান, তাদের মধ্যে খুব কমই গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত এই দেশটি সম্পর্কে জানেন। যারা সেখানে পাচার হয়ে যান, তারা প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন বন্দি হন দাসত্বের শৃঙ্খলে।