বিশ্বকাপে কাতারে যাওয়া বাংলাদেশি, নেপালি শ্রমিকরা ঋণের ফাঁদে

0
33

নিউজ ডেস্ক:
বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক কাতারকে কম বেতনের অভিবাসী কর্মীদেরকে জোরপূর্বক শত শত কোটি ডলার রিক্রুটমেন্ট ফি দিতে হয়েছে। গত এক দশকে এই ফি দিয়েছেন এসব অভিবাসীরা। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশি, নেপালি সহ অন্য দেশের অভিবাসী। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশিরা রিক্রুটমেন্ট ফি হিসেবে দিয়েছেন ১৫০ কোটি ডলার। এই পরিমাণ ২০০ কোটি ডলারও হতে পারে। এসব তথ্য উঠে এসেছে লন্ডনের অনলাইন গার্ডিয়ানের এক তদন্তে। এতে বলা হয়েছে, নেপালি অভিবাসীরা রিক্রুটমেন্ট ফি হিসেবে দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৩২ কোটি ডলার। এই সংখ্যা ৪০ কোটি ডলার পর্যন্তও হতে পারে।

২০১৫ সালের মধ্যভাগ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত তারা এই অর্থ দিয়েছেন। কাতারে কম বেতনের এসব শ্রমিকের মোট খরচ আরও বেশি হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলো থেকে যেসব শ্রমিক পাঠানো হয় তারাও উচ্চ হারে ফি দিয়ে থাকেন।

কাতারে আছেন প্রায় ২০ লাখ বিদেশি শ্রমিক। তার মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশই বাংলাদেশ ও নেপালের। তারা প্রতিজন যথাক্রমে তিন হাজার থেকে চার হাজার এবং এক হাজার থেকে ১৫০০ ডলার ফি হিসেবে পরিশোধ করেন। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ থেকে কম বেতনের একজন শ্রমিক কাতারে পৌঁছার পর তার রিক্রুটমেন্ট ফি তুলতে কমপক্ষে এক বছর কাজ করতে হয়। তারা মাসে ২৭৫ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এখন বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। কিন্তু এ সময়ে গার্ডিয়ানের এই অনুসন্ধান বলে দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রমিকদের কি ভয়াবহভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো এবং সেবামূলক প্রকল্পের কর্মী।

বাংলাদেশ এবং নেপালে সর্বোচ্চ সীমার অতিরিক্ত রিক্রুটমেন্ট ফি কাতারে আদায় বেআইনি। কিন্তু এই চর্চা ব্যাপকভাবে চলছে। গভীরভাবে চলছে। উপসাগরীয় সব দেশেই এই চর্চা একটি সাধারণ বিষয়। শ্রমিকরা তার নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগেই এই ফি পরিশোধ করে যেতে হয়। এ জন্য মাঝে মাঝেই তারা উচ্চ সুদ হারে ঋণ নিয়ে থাকেন অথবা জমি বিক্রি করেন। এর মধ্য দিয়ে তারা আরও বিপন্ন হন। তারা দাসত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়ে যান। এটা আধুনিক সময়ের দাসত্ব বলেও উল্লেখ করা হয় ওই রিপোর্টে।

এত চড়া ফি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি ও নেপালি হাজার হাজার শ্রমিক প্রতি বছর উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ খোঁজেন। এর কারণ, দেশে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের অভাব এবং কম মজুরি। অনেকে ঝুঁকির কথা জেনেই ফি জমা দেন। তারা জানেন, এই ঋণ শোধ করতে তাদের অনেক সময় লাগবে। কাঠমান্ডু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেখা যাবে এসব পরিবারের দেখা। সেখানে ‘ডিপার্চার হলে’ বহির্গামী অভিবাসীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিওতে কথা বলছেন। তাদের কপালের ওপর গাঢ় লাল ‘টিক্কা’। একজন শ্রমিক বলেছেন, বাস্তবেই আমি উদ্বিগ্ন। তা সত্ত্বেও আমাকে যেতে হবে। অর্থের সমস্যা আছে আমার।

ওদিকে এসব সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার কর্তৃপক্ষ। তারা আটটি দেশে রিক্রুটমেন্ট সেন্টার খুলেছে। শুরু হয়েছে ২০১৮ সালে। সেখানে শ্রমিকদেরকে বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। বাংলাদেশি শ্রমিক আমান উল্লাহর মতো অনেকেই উচ্চ হারে ফি পরিশোধ করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি কাতারে গিয়েছেন। এ সময় তার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। তাকে একজন ওয়েল্ডার হিসেবে মাসে ২৫০০ কাতারি রিয়াল বেতন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু পৌঁছার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি মরুভূমিতে। সেখানে মাসে ৮০০ রিয়ালে তাকে একটি কৃষি খামারে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, কাজের কোনো সীমা পরিসীমা নেই। আবাসনে কোনো বিদ্যুত, এয়ারকন্ডিশন নেই আমাদের। এমনকি আমাদেরকে কম্পাউন্ড ছেড়ে বের হতে দেয়া হয় না। অসুস্থ মাকে দেখতে দেশে আসার আগে তাকে কর্তৃপক্ষ ছুটি দেয়নি বাড়ি ফেরার। তিনি বাংলাদেশে ফিরেছেন। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেননি কোনো অর্থ। উল্টো দেখতে পেয়েছেন যে ঋণ নিয়েছিলেন, তা ফুলেফেঁপে আট লাখ টাকা হয়েছে। এই অর্থ শোধ করতে তাকে আবার ঋণ নিতে হয়েছে।