বাজারে আসছে ‘হোয়াইট’ ও ‘ইয়েলো চা’

0
200
  • সাধারণ চা বা ব্লাক-টি’র চেয়ে গ্রিন-টি’তে রয়েছে চারগুণ মানবদেহের উপকারী ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’
  • হোয়াইট-টিতে গ্রিন-টি’তে তার চেয়েও রয়েছে তিনগুণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট

নিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশের চাপ্রেমীরা এতোদিন পরিচিত ছিলেন ‘ব্ল্যাক’ ও ‘গ্রিণ টি’র সাথে। সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার বৃন্দাবন বাগান এবার চাপ্রেমীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ভিন্ন রঙ ও স্বাদের চায়ের আরও দুটি জাতের সাথে। দীর্ঘদিনের গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে এবার বাগানটিতে উৎপাদিত হয়েছে ‘হোয়াইট’ ও ‘ইয়েলো টি’। নতুন এই দুটি জাত চা শিল্পকে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ‘ব্ল্যাক’ ও ‘গ্রিণ টি’র কয়েকগুণ বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে নতুন জাতের এ দুই চায়ে। তবে চা বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে এই চা উৎপাদন সম্ভব হবে না। তবে সফলভাবে এ চা উৎপাদন করা গেলে বিদেশে এর ব্যাপক বাজার ও চাহিদা রয়েছে। রফতানির মাধ্যমে আয় করা যাবে বৈদেশিক মূদ্রা।

চা বাগান সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে দিন দিন চায়ের চাহিদা বাড়ছে। একই সাথে মানুষ ‘ব্ল্যাক টি’র পাশাপাশি ভিন্ন স্বাদের চায়ের দিকে ঝুঁকছে। ভোক্তাদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন বাগানে এবছর উৎপাদন করা হয় ‘ইয়েলো টি’ বা ‘হলুদ চা’। বাংলাদেশে এ চা খুব বেশি পরিচিত না হলেও বিদেশে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। হবিগঞ্জের বৃন্দাবন চা বাগানে উৎপাদিন ‘ইয়েলো টি’ গত ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম চা নিলাম কেন্দ্রে অকশনে তুলে পূর্ববাংলা ব্রোকার্স। পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদিত চায়ের পুরো লটটি প্রতি কেজি ৮ হাজার ৩শ’ টাকা দামে কিনে নেয় শ্রীমঙ্গলের গুপ্ত টি হাউজ। ১৮ মার্চ শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে একই বাগানে উৎপাদিত ‘ইয়েলো টি’ বিক্রি হয় ১২ হাজার ২শ’ টাকা কেজি দরে। দেশের ১৬০ বছরের চায়ের ইতিহাসে এটাই চায়ের সর্বোচ্চ দাম বলে মন্তব্য করেছেন শ্রীমঙ্গল টি ব্রোকার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহম্মদ। ২০১৮ সালে শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রের প্রথম নিলামে ইস্পানির বিশেষ মানের চা বিক্রি হয়েছিল ১১ হাজার টাকা কেজি দরে।

বৃন্দাবন চা বাগানের ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন খান গণমাধ্যমকে জানান, চাপ্রেমীরা সবসময় ভিন্ন স্বাদ চান। স্বাস্থ্য সচেতনরা ব্ল্যাক টি’র পরিবর্তে ‘গ্রিণ টি’, ‘ইয়োলো টি’ ও ‘হোয়াইট টি’ বেশি পছন্দ করেন। ভোক্তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করে পরীক্ষামূলকভাবে বাণিজ্যিকভাবে ‘ইয়েলো টি’ উৎপাদন করা হয়েছে। বাজারে এরকম চায়ের চাহিদাও রয়েছে। তিনি আরও জানান, বিশে^র মধ্যে কোরিয়া ও চীনে ‘ইয়েলো টি’ উৎপাদিত হয়। তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশেষ জাতের এই চা উৎপাদন করলো। আর বৃন্দাবন চা বাগান দেশের মধ্যে প্রথম এই চা উৎপাদন করেছে। বিশে^ চায়ের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নতুন স্বাদ ও গন্ধের চা উৎপাদনের বিকল্প নেই। এই চিন্তা থেকেই এ চা উৎপাদন করা হয়েছে। বাগানে উৎপাদিত ‘ইয়েলো টি’ আমেরিকাসহ উন্নত বিশে^র দেশগুলোতে রফতানির পরিকল্পনার কথাও জানান নাসির উদ্দিন খান।

ইয়েলো ক্যানসার প্রতিরোধক এবং হার্টের রোগ দূর করতে ভালো ভূমিকা রাখে বলেও মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। হার্টে ব্লক থাকলে এই চা নিয়মিত পানের ফলে সেই ব্লক ছুটে যায় বলেও বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।

এদিকে, ‘ইয়েলো টি’র মতো সারাদেশে সাড়া ফেলেছে ‘হোয়াইট টি’ও। বিশেষ জাতের এই চা-ও উৎপাদিত হচ্ছে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন চা বাগান। গত ৩ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে সিলভার নিডেল গ্রেডের ‘হোয়াইট টি’ নিলামে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ১০ টাকা দরে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ‘হোয়াইট টি’ বা ‘সাদা চা’ ক্যামেলিয়া সাইনেসিস থেকে উৎপন্ন হয়। চীনে প্রথম এই চা চাষ করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি এটি পূর্ব নেপাল, তাইওয়ান, উত্তর থাইল্যান্ড, গল (দক্ষিণ শ্রীলংকা) এবং ভারতে উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশেও এর উৎপাদন শুরু হয়েছে।

সাদা চা ক্যামেলিয়া সাইনেসিস নামক গাছের কুঁড়ি এবং পাতা থেকে তৈরি করা হয়। পাতা এবং গাছের কুঁড়িকে সূর্যের তাপে বিবর্ণ করা এবং শুকানো হয়।

সাধারণ চা বা ব্লাক-টি’র চেয়ে গ্রিন-টি’র মধ্যে চারগুণ মানবদেহের উপকারী ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট’ থাকে। আর হোয়াইট-টিতে গ্রিন-টি’র চেয়েও তিনগুণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।

‘ইয়েলো’ ও ‘হোয়াইট টি’র চাহিদা ও বাজার মূল্য বেশি হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দেশের বড় বাগানগুলোতে এটি উৎপাদন সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন বাগান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন উন্নত জাতের এই চা উৎপাদনে খরচ বেশি। প্রক্রিয়াজাত করতে হয় ম্যানুয়েলি। তাই শুরুতে এই চা উৎপাদনে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ চা সংসদ উত্তর সিলেট সার্কেলের চেয়ারম্যান নোমান হায়দার চৌধুরী জানান, সিলেটে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ইয়েলো’ ও ‘হোয়াইট টি’ উৎপাদন হয়েছে। দাম বেশি হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে এই চায়ের চাহিদা খুব বেশি নেই। তবে বিদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এরকম জাতের চা উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাই বাগানগুলো এরকম চা উৎপাদনে আগ্রহী হয় না।

তিনি বলেন, চা বাগান মালিকরা নিলামে চায়ের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। চা বিক্রি করে উৎপাদন খরচই বের করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন বাড়লে চায়ের দাম আরও কমে যায়। অথচ দিনকে দিন বাজারে প্যাকেটজাত চায়ের দাম বেড়েই চলছে। তাই চা শিল্পকে রক্ষায় নিলামে চায়ের মূল্য বাড়াতে হবে। বাগান মালিকরা লাভের মুখ দেখলে তারা নতুন জাতের চা নিয়ে আরো আগ্রহী হবেন।