কে হচ্ছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক?

0
31

দেবব্রত রায় দিপন : সবার কৌতুহল এখন জেলা পরিষদকে ঘিরে। কে হচ্ছেন প্রশাসক ? এই তালিকায় একাধিক নাম যুক্ত হলেও বারবার উঠে আসছে শফিকুর রহমান চৌধুরীর নাম। শফিকুর রহমান চৌধুরী বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। গত দুইবার প্রশাসক পদে মনোনীত হন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, তৃতীয়বারও এর ব্যত্যয় ঘটবে না এবং জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতিই হতে পারেন জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক।

১৭ এপ্রিল মেয়াদোত্তীর্ণের পর জেলা পরিষদে প্রশাসক বসানোর সুযোগ সৃষ্টি করে সরকার। সব ধাপ শেষ করে সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনের গেজেট গত ১৩ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ৬১টি জেলা পরিষদের মেয়াদ প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ায় পরিষদগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে।

জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের আগে প্রত্যেক জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পরিচালনার জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ওইদিনই সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দিপ কুমার সিংহকে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। একইসঙ্গে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্বাচন পূর্ববর্তী সরকার মনোনীত প্রশাসক দায়িত্ব পালন করবেন জেলা পরিষদের। তবে প্রশাসকের মেয়াদ ১৮০ দিনের বেশি হবে না। একইসঙ্গে একাধিকবার কেউ প্রশাসক থাকতে পারবেন না বলেও বিধান রাখা হয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।

এদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর চলে গেছে তিন দিন। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাকী চার দিনের মধ্যেই সিলেট জেলা পরিষদ পাচ্ছে নতুন প্রশাসক। এ নিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সচেতন মানুষের মধ্যে কমতি নেই উৎসাহের। এ ছাড়াও নিজেদের মতো করে অনেকেই প্রশাসক পদে নাম বলছেন বিভিন্নজনের। এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে অন্তত চারজনের নাম পাওয়া গেছে।

আলোচনায় উঠে আসা এই চারজন হলেন-জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ ও বিজিত চৌধুরী।

সিলেট জেলা পরিষদের প্রথম প্রশাসক মনোনীত হন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আব্দুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ান। তিনি ২০১১ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করলে ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই সিলেট জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসকের দায়িত্ব লাভ করেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। পরবর্তীতে শুন্য পদে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান সিলেট জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

এদিকে, প্রশাসক পদে শফিকুর রহমান চৌধুরীর পর বেশি করে নাম উচ্চারিত হচ্ছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিনের। আসাদ উদ্দিন আহমদ এর আগে সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ৯ জুন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের প্রশাসক পদে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। বর্তমানে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই আলোচনায় নাম রয়েছে অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের নাম। অনেকের ধারণা, ত্যাগী এবং কর্মঠ বিবেচনায় প্রশাসক হিসেবে স্থান পেতে পারেন তিনি। মহানগর সহ-সভাপতি বিজিত চৌধুরীও রয়েছেন এই আলোচনায়। তিনিও সিলেট চেম্বারের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন সফলতার সঙ্গে। ডাকসাইটে এবং আপোসহীন হিসেবে তাঁর সুনাম ছাত্রজীবন থেকে। গেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে সংখ্যালঘুদের যথাযথ মূল্যায়ন করেছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে সরকারি বিবেচেনায় তিনিও প্রশাসক পদের দাবিদার।

জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইনে ৮২ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে-এতে কোনও জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিষদের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। তবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগপ্রাপ্ত কাউকে প্রশাসক পদে বসানো হচ্ছে না-এমনটিও বলছেন সমাজকর্মীরা। তাদের মতে, সরকার যেকোনো মূল্যে জেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানটিতে নিজেদের পছন্দমতো লোককেই নিয়োগ দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবে।

সিলেট জেলা বারের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন বলেন, জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী পরিষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। জেলা পরিষদ আইনের ৮২ ধারার ০২ উপধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ফলে সরকার যেকোনও ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে। এই ব্যক্তি যে দলীয় হতে হবে তা-আইনে নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যখন যে সরকার আসে, সেই সরকার তাঁর অনুগত লোককেই প্রশাসক নিয়োগ করে থাকে। সে অদক্ষ, অযোগ্য বা দুর্নীতিবাজ হলেও প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়ে যায়। অথচ সরকার চাইলে দক্ষ, সৎ ও প্রজ্ঞাবান লোককে এক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না। সাধারণ নাগরিকের জন্য সাধারণ নাগরিক থেকে গ্রহণযোগ্য, সৎ, নিষ্ঠাবান ও দক্ষ ব্যক্তিদের প্রশাসক হিশেবে নিয়োগ করলে সরকার এবং জনগণের জন্য অধিকতর কল্যাণকর হতো বলে মনে করেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে কি কাজ করা উচিত এবং বিগত দিনে কি কি কাজ করা হয়েছে-তার একটি তথ্য উপস্থাপন করা ছিল জরুরি। পরিষদ আছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। আর কাজ করতে হলে দলীয় লোকের বাহিরেও অনেক যোগ্য মানুষ রয়েছেন। সুতরাং দলকেন্দ্রিক না করে পরিষদ এবং তার কার্যক্রম তুলে ধরতে হলে গ্রহণযোগ্য এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে পারে সরকার।

সিলেট মহানগর আওয়ামী সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি একান্তই সরকারের। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধানই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্বান্ত গ্রহণ করবেন। জেলা পরিষদে দল যাকে যোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করবে তাকেই প্রশাসক পদে আসীন করা হবে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক জেলায় একজন চেয়ারম্যান, ১৫ সদস্য ও ৫ নারী সদস্য অর্থাৎ মোট ২১ সদস্যের পরিষদ রয়েছে। আইন অনুযায়ী জেলার অন্তর্গত সিটি করপোরেশনের (যদি থাকে) মেয়র ও কাউন্সিলররা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জেলা পরিষদের ভোটার।